1. monir212@gmail.com : admin :
  2. support@wordpress.org : Support :
  3. merajhgazi@gmail.com : News Desk : Meraj Hossen Gazi
  4. desk@probashbarta.com : News Desk : News Desk
বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী ২০২২, ০১:২৮ অপরাহ্ন

দূর পরবাসে থেকে বাবার জন্মদিনে ছেলের অভিব্যক্তি

মোহাম্মদ মুজিবর রহমান, স্পেন :
  • প্রকাশিত : বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১
Print Friendly, PDF & Email

 

যাঁর হাতের আঙুলকে অবলম্বন করে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে শিখেছি, তিনি হচ্ছেন বাবা। প্রথম যাঁর কাছ থেকে স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ আর এক, দুই, তিন গুণতে শিখেছি তিনিও বাবা। দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোর মধ্যে কোনটা নাক, কোনটা কান, কোনটা চোখ আর কোনটা পা তাও তিনিই ইশারা করে করে শিখিয়েছিলেন।

প্রথম যাঁর কাছ থেকে কলম ধরতে শিখেছি তিনিও তো আমার বাবা। কোন হাত দিয়ে ভাত খেতে হয়, কিভাবে প্লেটে ভাত মেখে মুখে পুরতে হয়-এসবও তো তিনিই দেখিয়ে দিয়েছেন। সড়কের কোন পাশ দিয়ে হাঁটতে হয়, রাস্তায় মুরুব্বিদের দেখলে সালাম-আদাব দিতে হয়, কিভাবে জেব্রা ক্রস করতে হয় এর সবকিছুই-তো বাবা নামক বটগাছটি আমাকে শিখিয়েছেন।

আমাদের এলাকার লোকাল বাসগুলোর দরজায় “আগে নামতে দিন পরে উঠুন/ উঠতে ডান পা, নামতে বাম পা আগে বাড়ান” এরকম বাক্য লিখা থাকতো। এই বাক্যগুলো আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছিল যখন আমি টুকটাক বাংলা পড়তে শিখেছিলাম। কিন্ত বাংলা পড়তে শেখার অনেক আগেই-তো আমার বাবা আমার কর্ণকুহরে এসব বাক্যের ছবক শুনিয়ে দিয়েছিলেন।

এভাবে লিখতে আর বলতে থাকলে ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের মতো হাজারটা রাত চলে যাবে তবুও আমার বাবাকে নিয়ে আমার গর্বের শেষ হবে না।

আমার বাবা মাথা হতে পা অবধি আদ্যোপান্ত একজন সৎ এবং শিক্ষানুরাগী মানুষ।

বাবা একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার পরিসর ছোট হলেও সততা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ব্যবসা নীতিতে তিনি অটল।

শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যুগান্তকারী একজন সচেতন পিতা। ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে সজ্ঞান একজন মানুষ। নিয়মিত স্কুলে গিয়ে টিচারদের সাথে যোগাযোগ এবং ক্লাস বা পরীক্ষায় আমাদের পারফরম্যান্স সম্পর্কে খোঁজ রাখা ছিলো উনার স্বভাবগত ব্যাপার।

ছোটবেলায় আমাদের হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য আব্বা বলতেন,”লিখতে লিখতে দিন যদি তোমরা একটা করে খাতা শেষ করতে পারো, তবে পরদিন আরেকটা নতুন খাতা দেবো। শর্ত হচ্ছে, খাতার প্রত্যেকটা পাতার সর্বোচ্চ উপযোগ দেখাতে হবে।”

আব্বার বলা এই কথাটি আমি এখন গর্ব করে মানুষকে শুনাই। আমার হাতের লেখা আহামরি ভাল না, আবার অতোটা খারাপও না। বিশেষ করে এখানে যখন লোকজন আমার হাতের লেখার তারিফ করে তখন আমি তাদেরকে উপরোল্লিখিত বাক্যটি শুনিয়ে এর ফুল ক্রেডিট আব্বাকে দিয়ে দিই।

আব্বা বলতেন, ভাল রেজাল্ট কিংবা পড়াশোনার পূর্ব শর্ত নিজে সুস্থ থাকা। তো, আমাদের স্কুল (হাইস্কুল) আমাদের বাড়ি হতে মোটামুটি দূরে ছিল। একদিন প্রচন্ড বৃষ্টি। বৃষ্টি উপেক্ষা করেও আমার বড় আপা তার স্কুলে যেতে প্রস্তুত। কিন্ত আব্বা যেতে দিলেন না। বললেন প্রকৃতির অবস্থা ভাল না, ঘরে বসে পড়াশোনা করো। আর এদিকে আপার কথা হচ্ছে সে ক্লাস বাদ দিলে টিচার তাকে ফাইন করবে। তবুও আব্বা আপাকে যেতে দিলেন না।

কিছুদিন পর আপা আব্বার কাছে ফাইনের টাকা চাইলো। কিসের ফাইন জিজ্ঞেস করায় আপা বললো, বৃষ্টির জন্য ক’দিন স্কুলে যেতে পারি নাই; তাই স্যার ফাইন করছেন।

আব্বা ফাইনের টাকা না দিয়ে বরং একটা চিঠি লিখলেন শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে। চিঠির সারমর্ম ছিল এই, “প্রকৃতির বিরূপ পরিস্থিতিতে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্লাসে গেলে ছেলে-মেয়েদের শরীর খারাপ করার সম্ভাবনা থেকে যায়। ভাল পড়াশোনার জন্য বাচ্চাদের সুস্থ থাকাটা জরুরি। তাই ঝড়-বৃষ্টির দিনগুলোতে তাদের আমি স্কুলে যেতে উৎসাহিত করি না, ইত্যাদি।“

চিঠি পেয়ে শিক্ষক যা বুঝার বুঝে গেলেন, আর আপার কাছে কোন ফাইনও চাইলেন না। আমাদের ব্যাপারে আব্বা এভাবেই সচেতন আর দায়িত্ববান ছিলেন।

আমরা ভাই-বোনদের উৎসাহ-অনুপ্রেরণা যোগানোর ক্ষেত্রে আব্বা হচ্ছেন দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা মোটিভেশনাল স্পিকার। আমাদের উদ্দেশ্যে আব্বার অনেকগুলো অনুপ্রেরণামূলক বাক্য হতে এখানে একটা উল্লেখ করি- “তোমাদেরকে মানুষ করতে গিয়ে দরকার হলে ঘরের টিন (ছাল) বিক্রি করতেও পিছপা হবো না আমি।” বাবার মুখ হতে এমন বাক্য শুনার পর দুনিয়ার আর কোন মোটিভেশনাল স্পিকার এর বক্তব্য শুনার দরকার পড়ে বলে আমার মনে হয় না।

এছাড়াও আব্বা আমাদেরকে পারমিশন দিয়ে রেখেছেন যে, যেকোনো ভাল কাজে আমাদের প্রতি উনার শতভাগ সাপোর্ট রয়েছে, আমরা যেন পিছপা না হই।

আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবার। ছোটবেলা হতে এখন অবধি বাবা তাঁর সাধ্যের ভেতরে আমাদের সকল চাওয়া পাওয়া মিটিয়েছেন। আমাদেরও বাবার প্রতি কোন অভিযোগ নেই।

ছোটবেলায় স্কুল ফাঁকি দেয়া সহ বিভিন্ন দুষ্টুমির জন্য প্রচুর মার খেয়েছি বাবার হাতে। আমি পুকুরে সাঁতার কাটা বা গোসল করতে খুব ভালবাসতাম। একবার-তো স্কুলে না যেয়ে আমি পুকুরে সাঁতার কাটতেসি। আর আব্বা এসে একদম হাতের কাছে যা পেলেন (গরুর গোবর বাঁশের কঞ্চিতে শুকিয়ে একপ্রকারের জ্বালানি তৈরি করা হয়, হবিগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় যাকে গুমোট বলা হয়) তা দিয়েই মাইর শুরু।

কিন্ত বাবার গাল-মন্দ আর সকল শাসনকে আমি বা আমরা আশীর্বাদ হিসেবেই নিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ বাবার দোয়া আর আশীর্বাদে আল্লাহপাক ভালোই রেখেছেন আমরা প্রত্যেকটা ভাই বোনকে।

আব্বা-তো বলেই থাকেন, “তোমাদের আমি প্রচুর ধন সম্পদ দিয়ে যেতে পারবো না, কিন্ত আত্মা ভরে দোয়া দিয়ে যাচ্ছি।“  আর আমরাও আমাদের মুরুব্বীদের এ দোয়াকেই আমাদের চলার পথের পাথেয় হিসেবে নিয়েছি।

শুধুমাত্র একজন দায়িত্বশীল বাবাই নন তিনি। একাধারে ভাল একজন পরিবার কর্তা এবং স্বামীও। আমাদের পরিবারটার জন্য আজ অবধি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আব্বা। স্বামী হিসেবে তিনি শ্রেষ্ঠদের একজন। আম্মার সাথে তাঁর সুসম্পর্কই এর অকাট্য দলিল। কোনদিন তাঁকে আম্মার সাথে খারাপ আচরণ করতে দেখি নি আমরা।

বলতে বলতে কত স্মৃতিই মাথায় এসে ভর করেছে। আর এভাবে বলে বলে আমি তাঁর বিশালতার ব্যাখ্যা করে শেষ করতে পারবো না।

আমার বাবা সবসময় আমার কাছে একজন সুপার হিরো। সে আমার মাথার “তাঁজ”। যাঁর উসিলায় আমি এই পৃথিবীর আলো দেখেছি।

আজ আমার বাবার জন্মদিন। আল্লাহ আব্বাকে সু-স্বাস্থ্য সহ নেক হায়াত দান করুন। বটবৃক্ষের ছাঁয়া স্বরূপ চিরকাল আমাদের পাশে রাখুন। আমাদেরকে আব্বার খেদমত করার তাওফিক দান করুন। আজকের এই দিনে মহান রবের নিকট এটাই আমার ফরিয়াদ।

পৃথিবীর প্রত্যেকটি বাবাই একেকজন যোদ্ধা। একেকটি পরিবারের বটগাছ। ঝড়-ঝাপটা সব উনাদের উপর দিয়ে যায়, আমাদেরকে বুঝতে দেন না কোন অভাব। ভাল থাকুন দুনিয়ার প্রতিটি বাবা। আর যাদের বাবা আল্লাহর ডাকে সারা দিয়ে চলে গেছেন আল্লাহ উনাদের পরপারে ভালো রাখুন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরও খবর
© 2018 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখ, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যাবহার বেআইনি
Theme Customized BY LatestNews