Print Friendly, PDF & Email

 

মো. শামসুল ইসলাম সাদিক: দেশের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে প্রচুর সম্ভাবনা, যা দেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে নিতে পারবে। বৈশ্বিক ভাবনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সময়োপযোগী সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন দরকার।

দেশের জনসংখ্যা বোঝা নয়, হতে পারে জাতীয় সম্পদ। শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ বিকাশের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে দেশে একদিকে যেমন মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, বেড়েছে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাও। দেশের জনসংখ্যা সম্পদে পরিণত করতে হবে। বিশাল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর সুবর্ণ সুযোগ ।

চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীস্বল্পতায় শঙ্কিত, কিন্তু বাংলাদেশ ঠিক তার বিপরীত। পারমাণবিক অস্ত্র অপেক্ষা জনসংখ্যা বর্তমান বিশ্বের প্রধান সমস্যা। তাদের অভিমত, জনসংখ্যা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ। বিশেষত আমাদের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা যুক্তি তুলে ধরেন ভৌগোলিক পরিবেশ, অশিক্ষা, নিম্ন মানের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব, খাদ্যাভ্যাস, বাল্যবিবাহ, বহু বিবাহ, ছেলেসন্তান লাভের আশা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অজ্ঞতা, মৃত্যুর হার হ্রাস, বিনোদনের অভাব, দারিদ্র্য, কর্মহীনতা, আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রভৃতি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জনসংখ্যা সীমিত রাখার জন্যই এক্ষুনি কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এক সময় জনসংখ্যা বৃদ্ধি সমস্যা হিসেবে ভাবা হতো। এখন সেই বর্ধিত জনসংখ্যা আর সমস্যা নয় বরং সম্ভাবনা। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা শোনা যায়।
বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে অনেকেই বোঝা মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশের জনসংখ্যা বোঝা নয়। দেশের জনসংখ্যা সহনীয় মাত্রায় রাখার পাশাপাশি যদি জনশক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তাহলে দেশের জনসংখ্যা হবে সম্পদ। তবে প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারলেই তাদের উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে তারা স্বমহিমায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। সে ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরীতে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি কলকারখানা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে দেশের মানুষকে কাজ করার পথ করে দিতে হবে, যাতে করে দক্ষ জনশক্তি শিক্ষা-দীক্ষা, মেধা ও শ্রম ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারে।

দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি খুব একটা উদ্বেগজনক নয়। জনসংখ্যাকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলে জনশক্তিই হবে দেশের সম্পদ। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরে শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। যেখানে বিদ্যুৎতের আলো পৌঁছেনি, সেখানেও বহু আগে পৌঁছে গেছে শিক্ষার আলো। পাড়ায় পাড়ায় এখন শিক্ষিত লোক পাওয়া যায়। ডাক্তার-প্রকৌশলীও হচ্ছে গ্রামের মানুষ। কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে বাড়ায় এবং শিল্পায়ন ও সড়ক অবকাঠামো গড়ে ওঠায় শিল্পপণ্য যেমন মুহূর্তে পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামের মুদি দোকানে, তেমনি কৃষকের পণ্যও আসছে রাজধানীতে। মানুষের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসাসেবা সবই পৌঁছে গেছে গ্রামপর্যায়ে। ফলে দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি জীবনমানেরও উন্নতি হয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। দেশে এখন কর্মরত আছে প্রায় ছয় কোটি মানুষ। নারী ও পুরুষ কর্মক্ষেত্রে সমান ভূমিকা রাখছে। সে হিসাবে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪০-৪৫ লাখ। এই সময়ে শিল্প ও সেবা খাতে নারীর অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। ২০১০ সালে এক কোটি ৬২ লাখ নারী কৃষি, উৎপাদন ও সেবা খাতের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। সেটি এখন বেড়ে হয়েছে প্রায় দুই কোটি। জনসংখ্যা বিশারদদের ভাষায়, বাংলাদেশের জন্য এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যা থেকে ‘লভ্যাংশ’ পাওয়ার সময়। যেকোনো দেশের জন্য জনসংখ্যার বোনাস কাল একবারই আসে। আর এটি ২৫ থেকে ৩০ বছর স্থায়ী হয়। আমাদের দেশে ২০৪০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। জনমিতির পরিভাষায় ডিভিডেন্ড বলতে বোঝায় ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী মানুষের আধিক্য। বাংলাদেশে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে ২০১২ সাল থেকে। কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠীকে সর্বাধিক কাজে লাগাতে হলে প্রচুর কাজের সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করতে হবে।  এই বয়সের মানুষ সবচেয়ে কর্মক্ষম, যাঁরা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। সুযোগ কাজে লাগাতে সবার আগে জনসংখ্যাকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলা। কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিদেশের শ্রমবাজার উপযোগী দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা। বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ স্থবির। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগকে সর্বোচ্চ সুযোগ দিতে হবে। অবকাঠামো সৃষ্টিতে সর্বাধিক সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া নজর দিতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে। সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির জন্য এবং আয়বৈষম্য কমিয়ে রাখার প্রয়োজনে দুর্নীতি দমনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে। তাহলে জনসংখ্যা জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে সরকারকে নিতে হবে ইতিবাচক ভূমিকা।

বাংলাদেশে তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপ থেকেই দেশটির পথচলা। ছিল না অবকাঠামো, ছিল না কোনো প্রতিষ্ঠানও। স্বাধীনতার পর থেকে বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। একসময় বিশ্বে দুর্ভিক্ষে জর্জরিত দেশ হিসেবে পরিচত ছিল, যা এখন ইতিহাস। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক। সামাজিক উন্নয়ন সূচকগুলোতে বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেড়েছে তাই জনশক্তিকে আরও দক্ষ করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে কাজে লাগাতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সিংহভাগ অঞ্চলের মাটিই উর্বর ও আবাদযোগ্য। কৃষিক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে উৎপাদন বৃদ্ধি সহজ হবে। কৃষি, খাদ্য এবং জন্মনিরোধে বাংলাদেশের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। কৃষিকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি বলা হচ্ছে। দেশের ৮০০ থেকে ৯০০ কোম্পানি নিজস্ব উদ্যোগে সফটওয়্যার তৈরি করে রফতানি করছে। পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল ও সুযোগ-সুবিধা পেলে সফটওয়্যার রফতানিও তৈরি পোশাকের মতো বেকারত্ব দূর করে দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে বলে বিশ্বাস করি।

আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস জনসংখ্যা সমস্যা উত্তরণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিসম্পন্ন ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে সহায়ক হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, জনসংখ্যা সমস্যা থেকে উত্তরণে আমরা সচেতন। সরকারি-বেসরকারিভাবে আমরা যদি উন্নয়নের স্বার্থে সুপরিকল্পিতভাবে সুসংকল্পবদ্ধ, দৃঢ় প্রত্যয়ী ও কঠোর পরিশ্রমী হতে পারি তবে জনশক্তি দিয়েই সাফল্য সুনিশ্চিত।

লেখক: শিক্ষার্থী
এম. সি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সিলেট।

bdnewspaper24