Print Friendly, PDF & Email

মোস্তফা ফিরোজ: সাধারণত মালয়েশিয়া গেলে বুকিত বিনতাং এলাকায় থাকি। এবারই প্রথম কোতারোয়া এলাকায় একটি হোটেলে উঠি। এই কোতারোয়াকে বলা হয়, বাংলা-টাউন। কারণ এই এলাকায় বাংলাদেশি এতো বেশি যে, বোঝার উপায় নেই এটা মালয়েশিয়া। কিন্তু এবার দেখি ভিন্ন চিত্র। একেবারেই জনমানবহীন একটি এলাকা। দোকানগুলোতেও মালিক ছাড়া অন্য কর্মী নেই বললেই চলে।

যে হোটেলটিতে উঠেছি তার মালিক বাংলাদেশি। ম্যানেজারও বাংলাদেশি। সে সাংবাদিকতাও করে। পরিবর্তিত এই চিত্র দেখে তাকে প্রশ্ন করলাম, এলাকাটি এতো ফাঁকা কেন? উত্তরে সে জানায়, “ভাই সকাল-বিকাল দুই বেলা এখানে অভিযান চালায় মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশ। যাকে সামনে পায় তাকেই আটক করে নিয়ে যায়।”

পরিস্থিতি শুনে ও দেখে অবাক হবেন যে কেউ। ইমিগ্রেশন পুলিশের অভিযান দেখে মনে হয়, বাংলাদেশি চেহারা দেখলেই তাকে আটক করছে। বৈধ-অবৈধ বাছাবাছি নাই। এমনকি  ভিজিট ভিসায় যাওয়াদেরও আটক করা হচ্ছে। তবে দিন শেষে যাচাই বাছাই করে অনেককে ছেড়ে দেয়া হয়।

আটক হওয়া বৈধ বেশিরভাগ কর্মীকেই তিন চার দিনও থাকতে হয়, মালিক না যাওয়া পর্যণ্ত। এভাবেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কিন্তু অবস্থা এমন যে, এই প্রবাসীদের দেখভালের কেউ নেই।

মালয়েশিয়ায় একটা সময় ছিলো, কর্মীরা যে কোম্পানীর ভিসায় দেশটিতে গিয়েছে, ইচ্ছে করলেই অন্যত্র কাজ করতে পারতো। বিষয়টিকে দেশটি সহজভাবেই দেখতো। কিন্তু এখন সেই চিত্র নেই। পুরো বদলে গেছে। একারণে অনেক বাংলাদেশি আন-ডকুমেন্টেড হয়ে যাচ্ছেন।

দেখা যাচ্ছে, একটি কোম্পানীর ১০০ কর্মী নেওয়ার সক্ষমতা আছে, সেই প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে ২০০ বা ৩০০ কর্মী। বাকি কর্মী অন্য কোথায় কাজ করছে। এভাবেই অনেকেই অবৈধ হচ্ছেন।

আবার, নানা সময় ভিন্ন উপায়ে বা অন্য ভিসায়( কর্মী ভিসা বাদে) মালয়েশিয়া গিয়ে পরবর্তীতে আর বৈধতা পাননি।

২০১৬ থেকে ২০১৮ আগস্ট পর্যণ্ত চলা রি-হায়ারিং কর্মসূচিতে অনেক বাংলাদেশি কর্মী, এজেন্ট বা দালালদের কাছে টাকা দিয়ে ভিসা পাননি। এমন কর্মীর সংখ্যা অনেক। তারা এখন অবৈধ হয়ে অনিশ্চিত প্রবাস জীবন পার করছেন।

অবৈধ কর্মীদের কাতারে এমন কর্মীও আছেন, যারা জিটুজি প্লাস কলিং ভিসায় গিয়ে কারো প্রলোভনে বেশি বেতনের আশায় কোম্পানী পরিবর্তন করেছে। তারাও অবৈধ হয়ে গেছেন।

নানা ভাবে অবৈধ হওয়া কর্মীদের কথা বাদই যাক। কিন্তু যারা বৈধ কর্মী, তারা যে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তাদের বিষয়েও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন কোন ভুমিকা নিচ্ছে না। সেখানে হাইকমিশনার আছেন, শ্রম উইং আছে, শ্রম কাউন্সেলর আছেন, তারা কী করছেন? তারা এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোন কাজ করছেন না। প্রবাসীরা এভাবে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন, দিনের পর দিন জেল খাটছেন কিন্তু বাংলাদেশ হাইকমিশন কোন দায়িত্ব পালন করছে না।

শুধু তাই নয়, সেখানে যারা বাংলাদেশি সাংবাদিকরা আছেন, তারাও কোন সঠিক চিত্র তুলে ধরে খবর প্রকাশ বা প্রচার করতে পারছেন না। নানা প্রকার চাপের মধ্যে রাখা হচ্ছে তাদের। পরিস্থিতি এমন যে সেখানে আতঙ্কে আছেন প্রবাসী সাংবাদিকরাও।

একজন সাংবাদিক ( নাম প্রকাসে অনিচ্ছুক) বলছিলেন, “ভাই বাংলাদেশি এক মেয়ে কুয়ালালামপুরে একটি হোটেলে ধর্ষিত হয়েছেন। কিন্তু পুলিশ উল্টো মেয়েটিকে আটক করে জেলে পাঠিয়েছে। তিন মাস ধরে সেই মেয়েটি জেলে। হাইকমিশন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”

সেই সাংবাদিককে বলা হলো আপনি তাহলে ইন্টারভিউ দেন। নিউজ করি, বিষয়টি তুলে ধরি। তিনি বললেন, “ভাই সাহস নেই, এই কথা বললে হাইকমিশন আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেবে।”

এই হচ্ছে মালয়েশিয়ার বর্তমান অবস্থা। প্রবাসীরা নানা নির্যাতন, হয়রানির শিকার হলেও দেখার কেউ নেই।

২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম মালয়েশিয়ায়। সেখানে হাইকমিশনার শহিদুল ইসলামও যোগ দিয়েছিলেন। তাঁকে বলার চেষ্টা করছিলাম, মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে। তিনি এমন আচরণ করলেন, যেনো বিষয়টি কিছুই না। হাইকমিশনার বললেন, “ভাই এসব বিষয় আজকে থাক। এখানে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান।” বিষয়টা এমন প্রবাসীদের সমস্যা কোন সমস্যাই না।

অভিযোগ আছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের নানা অনিয়মের। সেখানে প্রদেশগুলোতে পাসপোর্ট তৈরির জন্য এজেন্ট আছে বলে অভিযোগ করেন অনেক প্রবাসী। সেখানে অনৈতিক লেনদেনও হয়। সেই টাকার ভাগবাটোয়ারা অনেক জায়গায় পৌছায় নিশ্চয়ই, নয়তো কেউ ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেনো ? হয়তো এসব কারণেই প্রবাসীদের দিকে নজর নেই দায়িত্বশীলদের অনেকেরই।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনাময় বড় একটি শ্রমবাজার। কিন্তু সেখানে এতো বেশি টালমাটাল অবস্থা, কিন্তু হাইকমিশর একেবারেই নিস্ক্রিয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোন কথা বলছে না। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও চুপ আছে, বিষয়টি রহস্যজনক মনে হচ্ছে। কারণ তারা কেউ বিষয়টি জানে না, এমন তো নয়।

মালয়েশিয়া পরিস্থিতি নিয়ে সকল গণমাধ্যমকে সোচ্চার হতে হবে। আসল চিত্র তুলে ধরতে হবে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরে না আসলে, বিষয়টির সমাধান হবে না। দূর হবে না প্রবাসীদের অসহায়ত্বও।

লেখক: হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন টিভি।

 

ভিডিও সৌজন্যে : TodaybanglaHD

 

all.bdnewspaper24.com